তিয়াত্তরতম অধ্যায়: পেছন পেছন আসা কাগজের মানুষ

বিষমানুষ নয়টি প্রস্রবণ জল 3102শব্দ 2026-03-19 08:42:18

আমি বিস্ময়ে অভিভূত হলাম, বিশাল ব্যাঙ, ছয় চোখের দেবব্যাঙ,竟花শ্বেতার গায়ে এসে পড়েছে। আমি তখনই ডাকতে যাচ্ছিলাম, দেবব্যাঙটিকে তাড়ানোর জন্য। মোটা কাকার গলা নিচু করে বললেন, ‘‘শাও কাং, ওকে ছেড়ে দাও,花শ্বেতা তো এখন বরফের মতো ঠাণ্ডা, আমরা শুধু একটা অলৌকিক ঘটনার আশায় থাকি।’’

আমার মনে এক অদ্ভুত আলোড়ন উঠল। যদি সত্যিই এমন হয় যে, চরম বিপদ থেকে বেঁচে গেলে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়, তবে সে সৌভাগ্যই যাক花শ্বেতার ভাগ্যে। আমার দৃষ্টি দেবব্যাঙটির উপর স্থির হল।

গুউ—গুউ! দেবব্যাঙটি গম্ভীর স্বরে ডেকে উঠল, তারপর হঠাৎ লাফিয়ে উঠল, আবার জোরে নেমে এল, এমনভাবে পিছনে পরপর দশ বারোবার লাফাল। এরপরই এক বিস্ময়কর দৃশ্য ঘটল।

আমি আর মোটা কাকা একসঙ্গে শুনলাম এক অতি ক্ষীণ কাশির শব্দ। আর সেই কাশি এসেছে花শ্বেতার গলা থেকে। আমরা দু’জনেই হতবাক, আমি তখনই বুঝে গেলাম, দেবব্যাঙটি花শ্বেতার বুকে বসেছিল, তাকে বাঁচানোর জন্যই।

ওর উঁচুতে লাফানো আর শক্তভাবে পড়া—সবই ছিল花শ্বেতার হৃদয়কে নাড়াতে। কাশির আওয়াজ মানে ওর আবার হৃদস্পন্দন আর শ্বাস এসেছে। আমি কষ্টে উঠে, দ্রুত ওর কাছে গেলাম।

দেবব্যাঙটি আবার গুউ—গুউ করে ডেকে,花শ্বেতার শরীর থেকে নেমে এলো, মাটিতে পড়ে এক ঝটকায় বড় পাথরে উঠে গেল, চমৎকার দ্রুত ওর গতি, সত্যিই ধরা কঠিন।

ও লাফানোর সময় আমি ওর চোখ দেখতে পেলাম—সাধারণ ব্যাঙের মতো নয়, ওর ছিল চারটি চোখ, বাকি দুটো তখনও বন্ধ।

ওর এই শক্তি ও অলৌকিকতা প্রমাণ করে দিল, ও সত্যিই এক দেবত্বপূর্ণ প্রাণী।

আমার হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা উপচে পড়ল, দ্রুত বললাম, ‘‘দেবব্যাঙ মহাশয়, আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ, আপনি আমাদের রক্ষা করলেন। এই বিষাক্ত পোকাদের উপত্যকা আপনার জন্য নিরাপদ নয়। কালো ফুলের গুহার কৃষ্ণপোশাকী গুরুও এবং সেই বিষপ্রেমী শেন বয়সী, দু’জনেই জানে আপনি এখানে, তাই তাড়াতাড়ি নিরাপদ আশ্রয় নিন, দয়া করে চোট খাবেন না!’’

আমি তখন বিশাল অজগরটির কথা ভাবলাম, দেবব্যাঙের প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকেই এত কথা বললাম। দেবব্যাঙটি আবার গুউ—গুউ করে ডেকে, দেয়ালের পাথর বেয়ে দ্রুত লাফিয়ে洞ের প্রবেশপথের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

ও চলে যাওয়ার পর, সাদা কুকুর আর কুকুরের পাল তখন একটু সাহস পেল। ছোট সাদা কুকুরটি ছুটে এসে আমার গায়ে মাথা ঘষল অত্যন্ত স্নেহে। আমি ওর মাথা চুলকাতে চুলকাতে প্রশংসা করলাম।

ছোট সাদা কুকুরটি সত্যিই আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল।

আমি ঝুঁকে花শ্বেতার নাকের কাছে হাত রাখলাম, অনুভব করলাম সামান্য নিশ্বাস রয়েছে, আবার গলায় রাখলাম, খুব হালকা হৃদস্পন্দন টের পেলাম।

আমি আনন্দে লাফিয়ে উঠতে চাইলাম, বললাম, ‘‘মোটা কাকা,花শ্বেতার শ্বাস আর হার্টবিট দুটোই ফিরে এসেছে, নিঃসন্দেহে দেবব্যাঙ ওকে বাঁচিয়েছে। চলো তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাই, আমি花শ্বেতাকে পিঠে নিয়ে যাব!’’

মোটা কাকা হাঁফাতে হাঁফাতে উঠে বললেন, ‘‘ঠিকই বলেছ, এখানে বেশি সময় থাকা ঠিক নয়, চলো花শ্বেতাকে নিয়ে চলে যাই।’’

মোটা কাকা আমার পড়ে যাওয়া ঝুড়ি তুললেন, কালো খুলি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘শাও কাং, এটা নিয়ে যাবো?’’

এসময় ছোট সাদা কুকুরটি কয়েকবার ঘেউ ঘেউ করল।

আমি মাথা নেড়ে বললাম, ‘‘নিয়ে চলো, ছোট সাদা কুকুরটি সম্ভবত জানে এই খুলি কার। সঙ্গে রাখলে কাজে লাগবেই।’’

মোটা কাকা খুলিটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে বললেন, ‘‘এ খুলির পেছনে তো থাবার দাগ!’’

পাথরের ওপরে অলস ঘুমে ঝিমানো সোনালী রেশমপোকা এক লাফে ঝুড়িতে গিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।

মোটা কাকার ডান পা জখম, তিনি কাতরাতে কাতরাতে সামনে এগোলেন, আমি花শ্বেতাকে পিঠে নিয়ে, বুকে তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করে, ধীরগতিতে এগোতে লাগলাম। গতি কম হলেও আমরা এগোচ্ছি।

ছোট সাদা কুকুর ও কুকুরের পাল চারপাশে ঘুরতে লাগল, কয়েকটি যেগুলি আগে বিছার গুহার গভীরে গিয়েছিল, তারাও ফিরে এলো। সাধারণত পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানো কুকুরেরা বেশিরভাগ সময় পাগলাটে, মাঝে মাঝে কামড়েও দেয়। কিন্তু ছোট সাদা কুকুরের শাসনে তারা অত্যন্ত শান্ত ও বাধ্য ছিল।

অনেক কষ্টে আমরা বিছার গুহা থেকে বেরিয়ে এলাম।洞ের সামনে দাঁড়িয়ে,洞ের ভেতর একবার তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘‘গুরুজি, আপনার洞 এখন চোরদের আস্তানা হয়ে গেছে। আমি আপনার কাছে অপরাধী। আমাদের নিরাপদে চা ফুলের গ্রামে ফিরতে আশীর্বাদ করুন!’’

洞ের মুখ থেকে ঠান্ডা বাতাস বইছিল, মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। চারপাশে অন্ধকার ঘন হয়েছে, ভালই হয়েছে, প্রবল বৃষ্টির পর আকাশে আর মেঘ নেই, চাঁদটি উজ্জ্বল, তার আলো চমৎকার পরিষ্কার।

চাঁদের আলোয় পথ আর কষ্টকর মনে হল না। দশ মিনিটের মতো চলার পর, পিছন থেকে ‘‘ঈঁঈঁঈঁ’’ আওয়াজ শুনলাম। মোটা কাকা গর্জে উঠলেন, ‘‘কে ওখানে, বেরিয়ে আয়!’’

ছোট সাদা কুকুর আর বন্য কুকুরের পাল একসঙ্গে চিৎকার করল।

আমি ফিরে তাকিয়ে দেখি, সাত-আটটি সাদা কাগজের মানুষ গাছের ডালে লুকিয়ে রয়েছে, তারা বিছার洞 থেকে বেরিয়ে চুপিচুপি আমাদের পিছু নিয়েছে।

কাগজের দেহে কাঁপুনি, গলা দিয়ে ঈঁঈঁ আওয়াজ, দেখতে খুবই করুণ, চাঁদের আলোয় তাদের দেহ জ্বলজ্বল করছে, অদ্ভুত মর্মান্তিক দৃশ্য।

আমি মনে পড়ে গেলাম, কাগজের দিদি আমাকে বিষ পোকাদের উপত্যকা থেকে বাঁচিয়েছিল। তখন শেন ইনশান আর মিয়াও শিউপিং আমাকে ধরে ফেলেছিল, সেই দিদি নিজের বিপদ জেনেও আমাকে উদ্ধার করেছিল। আমি কাগজের দিদির প্রতি কৃতজ্ঞ, দ্রুত বললাম, ‘‘ছোট সাদা কুকুর, থামো, ওরা খারাপ নয়!’’

আমি ছোট সাদা কুকুরের ডেকে ওঠা থামিয়ে, গাছের ওপর সাদা কাগজের মানুষদের বললাম, ‘‘তোমরা কেন আমার পিছু নিয়েছ… চলে যাও, যতক্ষণ না পুরোহিত আর সন্ন্যাসীদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, এড়িয়ে চললেই হল।’’

কাগজের দিদি তখন পুরাতন ফেই আর পুরাতন জে-র সঙ্গে দেখা করায়, কাগজের দেহ ছিঁড়ে, কাগজের আত্মা হয়ে গিয়েছিল।

এদের মধ্যে যে প্রধান, সে গাছ থেকে নেমে এসে কুকুরদের দেখে একটু কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এল, আমার পাশে থেমে অল্পস্বরে ডেকে, হাতে কিছু অদ্ভুত চিহ্ন দেখাল।

আমি শাও ফেং-এর সঙ্গে কখনো কখনো ইশারায় কথা বলতাম, তাই ভাবলাম, কিছুক্ষণ ভেবে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘তোমরা কি আমার সঙ্গে যেতে চাও?’’

সাদা কাগজের মানুষটি আনন্দে মাথা ঝাঁকাল, তার পেছনে লুকিয়ে থাকা বাকিরাও মাথা নাড়ল।

আমি অবাক হয়ে মোটা কাকার দিকে চাইলাম।

মোটা কাকা বললেন, ‘‘ওরা হয়তো কালো পোশাকী গুরুর নিরীহ বলি, তোমার ওদের বিরুদ্ধে লড়াই দেখে, তোমার পাশে থাকতে চায়, তোমার নির্দেশ মানতে চায়।’’

আমি একটু ভেবে বললাম, ‘‘তোমরা আমার সঙ্গে যেতে পারো, তবে কাউকে ভয় দেখানো বা খারাপ কিছু করা যাবে না। যদি এ শর্ত রাখতে পারো না, তাহলে আমার সঙ্গে যেও না, নিজে যেখানে ইচ্ছা চলে যাও।’’

কাগজের মানুষরা দ্রুত মাথা নাড়ল, তারপর আবার ঈঁঈঁ আওয়াজ তুলল।

আমি ভাবলাম, কাগজের আত্মা মানেই লাল-সবুজ কাগজের মানুষ, তাদের নিয়ে গেলে কাগজের আত্মা দেখভাল করবে, ওরও কিছু করার থাকবে।

শেষবার সম্মতি দেওয়ার আগে আমি আবার মোটা কাকার দিকে চাইলাম, ‘‘আমি... ওদের নিয়ে যেতে পারি তো?’’

এর আগে তো আমি ছোট সাদা কুকুর রাখতে বলেছিলাম, এবার এতগুলো কাগজের মানুষ নিয়ে যাচ্ছি, হয়তো মোটা কাকা বিরক্ত হবেন।

মোটা কাকা হেসে বললেন, ‘‘তুমি চাইলে নিয়ে চলো। কাগজের মানুষ তো, খাওয়ার কিছু লাগে না। দশটা বাচ্চা হলে ভাবতাম, ওদের খাওয়াবো কী!’’

আমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে বললাম, ‘‘মোটা কাকা, আপনি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো কাকা, আমি কখনও আপনার মতো ভালো কাকা দেখিনি।’’

মোটা কাকা একটু থেমে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘এটা সত্যি, না কি আমাকে খুশি করার জন্য বলছ?’’

আমি জিভ বের করে বললাম, ‘‘একদম মন থেকে বলছি।’’

মোটা কাকা হেসে উঠলেন, ‘‘বড় অদ্ভুত, তোমার কথায় আমার ব্যথার কথা ভুলে যাচ্ছি, মনে হচ্ছে তোমার কথা শুনলে ব্যথা কমে যায়।’’

‘‘মোটা কাকা পৃথিবীর সেরা কাকা, সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ, সবচেয়ে বুদ্ধিমান…’’ আমি একের পর এক বলতে লাগলাম।

মোটা কাকা হাসতে হাসতে বললেন, ‘‘আর না, আর না, বেশি শুনলে পা-র ব্যথা যাবে, কিন্তু পেট ব্যথা শুরু হবে!’’

আমি গাছের ওপর কাগজের মানুষদের বললাম, ‘‘মোটা কাকা অনুমতি দিয়েছেন, তোমরা নেমে এসো। আমার কথা মনে রেখো, কারও ক্ষতি করবে না, কাউকে ভয় দেখাবে না!’’

তারা গাছ থেকে নেমে, কুকুরদের পাশ দিয়ে, প্রধান কাগজের মানুষের পাশে এসে সবাই একসঙ্গে কোমর বাঁকিয়ে আমাকে প্রণাম করল।

আমি হাত নেড়ে বললাম, ‘‘এত ভক্তিসম্পন্ন অভিবাদন লাগবে না। আমি শাও কাং এসব পছন্দ করি না। তোমরা কীভাবে এসেছিলে, কাগজের মানুষ হলে কেমন, সব জানার পরে নিশ্চয়ই তোমাদের নিরাপদে বিদায় দেব!’’

কাগজের মানুষরা ঈঁঈঁ আওয়াজ তুলে আমাদের পিছু নিল।

আমরা আবার চাঁদের আলোতে একটু এগিয়ে চললাম, সেই ঝরনার সামনে এসে পৌঁছালাম। এই ঝরনা পার হলেই আমরা বিষাক্ত পোকাদের উপত্যকা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যাব, আপাতত বিপদ থেকে মুক্তি।

বিষ পোকাদের উপত্যকায় যা কিছু ঘটেছে, তা ভেবে মনে হচ্ছিল অবিশ্বাস্য।

আমরা জল পেরিয়ে এলাম, কাগজের মানুষরা নদীর কিনারার ডালে ভর করে, লাফিয়ে ওপারে গেল। ওপারে গিয়ে ছোট সাদা কুকুর কুকুরের পালকে তাড়িয়ে দিল।

বন্য কুকুরের দল চাঁদের দিকে কয়েকবার ঘেউ ঘেউ করল, তারপর পাহাড়ের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল, চারদিকে নিস্তব্ধতা নেমে এল।

মোটা কাকা বললেন, ‘‘আমাদের সবার শরীরে আঘাত আছে, একটানা চা ফুলের গ্রামে ফেরা অসম্ভব। আমি যদি হতাম কালো পোশাকী গুরু আর শেন বৃদ্ধ, তবে রো দাজিনকে নিয়ে পথে আমাদের আটকাতাম!’’

মোটা কাকার এই কথায় আমি সতর্ক হলাম, বিপদ থেকে আপাতত মুক্ত, কিন্তু পুরোপুরি নয়। যদিও বিষ পোকাদের উপত্যকা থেকে বেরিয়েছি, এখনো কালো ফুলের গুহার এলাকায় আছি, আমাদের শরীরে আঘাত, সঙ্গে কাগজের মানুষ, যদি রো দাজিন মাঝপথে আক্রমণ করে, আমাদের জীবন ফের হুমকিতে পড়তে পারে।

আমি তাই জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘তাহলে আমাদের এখন কী করা উচিত...’’