অষ্টত্রিংশ অধ্যায়: অসীম দস্তানায় উন্নতি আনা
পিএস: আমার প্রিয় পাঠক ‘শুদ্ধ শুদ্ধ’র পাঁচ হাজার স্বর্ণ মুদ্রার পুরস্কারের জন্য কৃতজ্ঞতা! আরও অনুরোধ করছি সংগ্রহে রাখুন ও সুপারিশ করুন।
অকারণে অতিরিক্ত সদয়তা, নিশ্চয়ই কোনো ফন্দি আছে!
যদি চশমা পরা ছেলেটি একজন মেয়ে হতো, তবে রোচিং হয়তো ভাবত, তার অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে পড়েছে সে! কিন্তু এখন যতই ভাবুক না কেন, নিশ্চিতভাবেই কোনো স্বার্থ লুকিয়ে আছে!
দৃষ্টিতে একবার সংশয় ঝলকে উঠতেই রোচিং অত্যন্ত ‘উচ্ছ্বসিত’ স্বরে বলল, ‘‘ভালোই তো, তাহলে তোমারই কষ্ট হবে। কে জানে, সেই বদরাগী মেয়েটি যে দিক নির্দেশকটি ছুঁড়ে দিয়েছে, সেটা কোথায় নিয়ে যাবে? হতে পারে কোনো নিশ্চিত মৃত্যুপুরী, আমার ভালোবাসা না পেয়ে প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে!’’
চশমাওয়ালা ছেলেটি মনে মনে বমি চেপে রাখার চেষ্টা করল, ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করে, ‘‘তুমি কি সিরিয়াস?’’ কিন্তু রোচিংয়ের সেই উদগ্রীব চাহনি দেখে সে এবারে এই আত্মপ্রেমী পাগলের সঙ্গে আর কথা বাড়ানোর ইচ্ছা ছেড়ে দিল।
‘‘চলো তবে, কিন্তু হারিও না যেন।’’
...............
রোচিংও জানে না, চশমাওয়ালার হাতে থাকা দিক নির্দেশক আদৌ কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। তবু সে পেছনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। চশমাওয়ালা যেমন তাদের নিয়ে কোনো পরিকল্পনা করছে, ঠিক তেমনি রোচিংও ছলচাতুরীর আশায় তার পঞ্চান্ন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকার মাথার দিকে তাকিয়ে আছে!
‘‘তুমি কি সত্যিই ওদের সঙ্গে যাবে? আমার মনে হয়, ওরা ভালো মানুষ নয়!’’ নামি কিছুটা উদ্বিগ্ন স্বরে বলল।
তারও বিশ্বাস, আগের সেই বদরাগী মেয়েটির ছুঁড়ে দেওয়া দিক নির্দেশকটি বেশি নির্ভরযোগ্য, কোনো যুক্তি ছাড়াই, নারীর স্বজ্ঞা!
‘‘চিন্তা কোরো না, ওরা যদি কিছু না করে, তাহলে ভালো। আর যদি কোনো খারাপ উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে তো আমাদের কপাল খুলবে!’’
নামি ভাবল, এটাই তো সত্যি! পুরস্কারের টাকা, তার ওপর ‘শ্রোডিঙ্গার’-এর গুপ্তধন...
নামি মুহূর্তেই চনমনে হয়ে উঠল, মনে হতে লাগল, ওরা যদি এখনই ঝামেলা করতে আসে!
এ লোকটার আর কোনো উপায় নেই!
রোচিং আর কাবির দৃষ্টির বিনিময়ে দুজনেই একে অপরের চোখে আফসোস দেখতে পেল।
কাবিকে নাবিকের দায়িত্ব দিয়ে রোচিং নিজের কক্ষে ফিরে গিয়ে বিশ্রাম নিল, যাতে যেকোনো মুহূর্তে আসন্ন ভয়ঙ্কর লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে পারে!
এই তো, একটু আগে সেই বদরাগী মেয়েটির নাম কী ছিল?
কিছু...বনি?
আচ্ছা?
বনি জলদস্যু দল...গোলাপি চুল...ঠোঁটে বেমানান লিপস্টিক...চঞ্চল স্বভাব...এবং এসের সঙ্গে সম্পর্ক...
ওহ, এ তো সেই ভোজনরসিক মেয়েটা!
ভবিষ্যতে লুফির সঙ্গে একসঙ্গে ‘সুপারনোভা’ হিসেবে পরিচিত এগারো জনের একজন!
এবার বোঝা গেল, ও কেন এসের খোঁজ নিচ্ছে।
এই বদরাগী মেয়েটির পরিচয় কিন্তু একেবারেই সাধারণ নয়!
এস মারা গেলে সে কেঁদেছিল!
শ্বেতদাড়িকে দেখেও কেঁদেছিল!
আবার, সপ্তশক্তিধর বাহিনীর প্রাক্তন সদস্য— সেই নির্দয় ভালুক যখন স্বর্গীয় অধিপতি দ্বারা বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল, তখনও সে আবার কেঁদে উঠেছিল!
এমনকি ছোট লাল কুকুরও তার পালিয়ে যাওয়ায় বিস্মিত ও আতঙ্কিত হয়েছিল!
তার পরিচয় নিয়ে পৃথিবীতে নানান বিতর্ক চলছে!
কেউ কেউ চরিত্রের ভিত্তিতে বলে, সে আসলে এসের দিদি।
আবার কেউ কেউ বলে, সে শ্বেতদাড়ির কন্যা, এবং ক্রোকডাইলের বোন...
আরও কেউ কেউ ধারণা করে, সে হয়তো শ্বেতদাড়ির যুগের মানুষ, শয়তান ফলের শক্তির কারণে এত তরুণ দেখায়, আসলে এসের অভিভাবক, শ্বেতদাড়ির ঘনিষ্ঠ, এমনকি বিপ্লবী বাহিনীতেও তার ভূমিকা আছে...
সবমিলিয়ে অনেক রকমের কথা শোনা যায়, তবে সবচেয়ে সম্ভাব্য মনে হয় প্রথমটি, এসের দিদি!
এবং একটু আগের সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতে, এ অনুমান আরও দৃঢ় হয়েছে।
ওই দুষ্ট ওদা আবার! রোচিং মনে মনে গালি দিল, কত বছর হয়ে গেল, পুরোনো রহস্য ফাঁকা রেখে নতুন রহস্য তৈরি করছে!
সে এই জগতে প্রবেশ করার আগেই, কী কী ছিল না? সন্দেহজনকভাবে বিগ মামা এবং কাইডোর ক্যাপ্টেন রক্স, রাজসিংহাসনে বসা পাঁচ প্রবীণদের নেতা ইম...
এ জগতের গভীরতা সীমাহীন!
রোচিং যদি এই জগতে প্রবেশ না করত, তাহলে মনে হয় জলদস্যু কাহিনীর সমাপ্তি হয়তো তার নাতি তাকে কাগজে লিখে পাঠাতো!
‘‘ভালো করে মনে আছে, ওর শয়তান ফলের শক্তি ভীষণই অদ্ভুত, সে যাকে স্পর্শ করে তার বয়স ইচ্ছেমতো বাড়াতে-কমাতে পারে!’’
শিশু, বৃদ্ধ, বার্ধক্য, তারুণ্য...
সময় নামক ধারণাটিই যেন তার ফলের ক্ষমতায় বিকৃত হয়েছে!
ভয়াবহতায় ‘ক্যান্ডি’-র সেই বিকৃত ক্ষমতার সমতুল্য!
ভাগ্যিস একটু আগে লড়াই লাগেনি, নইলে সামান্য অসতর্কতায় ফাঁদে পড়ে যেতাম!
ভয় মেশানো সন্ত্রস্ত রোচিং সঙ্গে সঙ্গে স্মোকারের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনা সমুদ্রপ্রস্তরের অস্ত্রটি বের করল, মনে হল কেবল এই ক্ষমতাধারীকে দমন করার অস্ত্রই তাকে নিরাপত্তা দিতে পারে।
‘‘উফ! এ ভাঙা অস্ত্রটা ব্যবহার করতেই বড় অসুবিধা!’’
ডান হাতে অসীম গ্লাভস পরে কয়েকবার নাড়িয়ে রোচিং খুশি হতে পারল না।
‘‘যদি অসীম গ্লাভসেও সমুদ্রপ্রস্তরের উপাদান থাকত তো কত ভালো হতো...’’
তার কথা শেষ হওয়া মাত্র, হাতে থাকা অসীম গ্লাভস থেকে হালকা সাদা আলো ছড়িয়ে পড়ল।
তৎক্ষণাৎ সমুদ্রপ্রস্তরের তৈরি অস্ত্রটি উধাও হয়ে গেল!
রোচিং বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল, অসীম গ্লাভসের উপর ধূসর কিছু একটা ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল, আবার গ্লাভসের চমকদার রূপ উন্মুক্ত হল।
‘‘এটা কি সত্যি! আমি তো শুধু বলেছিলাম! সত্যিই হয়ে গেল!’’
এ শোষণ ও রূপান্তর ক্ষমতা তো একেবারে অবিশ্বাস্য!
রোচিং নিশ্চিত, সেই সমুদ্রপ্রস্তরের অস্ত্রটি অসীম গ্লাভস শুষে নিয়েছে, এখন কেবল জানতে চায়, অসীম গ্লাভস কি সমুদ্রপ্রস্তরের বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে কিনা!
সুযোগ পেলে অবশ্যই পরীক্ষা করে দেখবে!
রোচিং দারুণ উত্তেজিত হয়ে ভাবল!
জানতে ইচ্ছে করছে, এই অসীম গ্লাভসে কত বিস্ময়কর ক্ষমতা লুকিয়ে আছে, যা তার আবিষ্কারের অপেক্ষায়!
সুখী মনে রোচিং এক লাফে উঠে দাঁড়াল, তারপর নামির কক্ষের দরজা ঠেলে খুলে গেল...
এক মিনিট পর, বিকট গালাগালি ও নানা টেবিল, চেয়ার, বাক্স ছুড়ে বের করে দেওয়া রোচিং মুখে বিব্রত হাসি নিয়ে বেরিয়ে এল।
‘‘কেনো রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে? এখনই যদি পরে রাখো, আমি একটু দেখলে কী-ই বা এমন হবে!’’
রোচিং ফিসফিস করে বলল ও হেসে উঠল।
দেখা যাচ্ছে, ভবিষ্যতেও দরজা না ঠুকেই ঢোকার এই দারুণ অভ্যাস বজায় রাখতে হবে, না হলে এ রকম উত্তেজক দৃশ্য কই পাবে!
হালকা সুর গাইতে গাইতে রোচিং গিয়ে কাবির জায়গা নিল, ভুল বোঝো না, এটা ছাত্র কাবির জন্য মায়া নয়, বরং ওকে দিয়ে জাহাজঘর আর নামির ঘর গুছিয়ে নিতে পাঠিয়েছে...
কাবি মুখ কালো করে গিয়ে ঝামেলা সামলাতে গেল!
কাঁদা যাবে না, কাবি! একদম কাঁদা যাবে না! তুমি তো ন্যায়ের সহযোদ্ধা! নিশ্চয়ই এসব শিক্ষকের পরীক্ষা! শিক্ষকের ওপর আস্থা রাখো!
এমনি ভাবতে ভাবতে কাবি চোখের কোনে জল নিয়ে নামির দরজায় টোকা দিল।
তারপর, শোঁ করে এক শব্দে, ধপ করে আরেক শব্দে—
কাবি মুখ ফুলে বিশাল আকার নিয়ে উড়ে এল!
আহা! এই দৃশ্যটা আবার কেমন চেনা চেনা লাগছে!
সত্যিই, ঠোঁটে ঠাণ্ডা হাসি নিয়ে নামি আবার নিজের সুন্দর পা নামিয়ে রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘‘শিক্ষক এত বিকৃত হলে, ছাত্রও নিশ্চয় কিছু ভালো শিখবে না!’’
‘‘অন্যায়!’’, দুজনই একসঙ্গে চিৎকার করল!
‘‘আমি কই বিকৃত!’’
‘‘শিক্ষক যদি বিকৃত হন, তাতে ছাত্রও যে এমনই হবে, তা তো নয়!’’
রোচিং ও কাবি একসঙ্গে ‘অভিমানী’ স্বরে বলল!
বড় চোখে ছোট চোখের দিকে তাকাল!
‘‘তুমি তো সত্যিই আমার ভালো ছাত্র (শিক্ষক)!’’
তারপর গুরু-শিষ্যের মাঝে এক অদ্ভুত বিব্রতকর পরিবেশে ছেয়ে গেল...