পঁয়তাল্লিশতম অধ্যায় সরে দাঁড়ाओ

ছায়া-দূত পরিবর্তন করো সংজ্ঞা 3380শব্দ 2026-03-19 08:32:15

একটি নিঃশব্দ রাত কেটে গেল। পরদিন ভোরে, আমি তখনও আধো ঘুমে ছিলাম, হঠাৎই মুটে চেহারার লোকটি এক লাথিতে আমাকে জাগিয়ে তুলল। তার লাথিটা এত জোরালো ছিল যে মনে হচ্ছিল আমার পশ্চাৎদেশ মাংসপিণ্ডে পরিণত হবে। গত রাতে আমি একটার পরও তাবিজ আঁকছিলাম, ভোর পাঁচটার দিকে আবার উঠে প্রাতঃরাশের অনুশীলনে মন দিয়েছিলাম। অনেক কষ্টে আবার নিজের বিছানায় ফিরে ঘুমাতে পেরেছিলাম, স্বপ্নের রাজ্যে পা দিয়েছিলাম, কিন্তু এই মুটে কিছুতেই আমাকে শান্তিতে থাকতে দিল না।

‘কি হয়েছে?’ আমি বিরক্ত মুখে কপাল কুঁচকে, অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিছানা থেকে উঠলাম। তবে মুটের সাজসজ্জা দেখে আমি থমকে গেলাম। আজ সে একেবারে আধুনিক পোশাকে সজ্জিত—তকতকে স্যুট, চুলের টুকরোগুলোতে জেল লাগানো, যেন প্রত্যেকটি চুল উজ্জীবিত হয়ে মাথায় দাঁড়িয়ে আছে, পায়েও চকচকে পালিশ করা চামড়ার জুতো। আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে অবচেতনে বলে ফেললাম, ‘ভাই, তুমি কি আজকাল ডাকাতি করতে যাচ্ছো? তোমার এই বয়স ও আকার-আকৃতিতে তো বাজারে বিশেষ চাহিদা নেই।’ এই কথা বলতেই সে রাগে আমার মাথায় চড় বসাল, ব্যথায় আমি দাঁত কিড়মিড় করে উঠলাম।

‘আজ তোমাকে সঙ্গে নিয়ে অশুভ আত্মা ধরতে যাব, দেখো তো আমার আসল ক্ষমতা কেমন।’ মুটে মনে পড়ে গেল প্রথমবার আমাকে সঙ্গে নিয়ে ভূত ধরতে গিয়ে কী বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছিল—ছোট ভূত ভেবেছিল, অথচ সে ছিল আড়ালে এক মহাশক্তিশালী আত্মা। এবার সে নিজের মান-ইজ্জত ফেরত আনার জন্য আবার আমাকে নিয়ে চলল।

‘কিন্তু পুরোহিতরা তো ভূত ধরতে গেলে সাধারণত ধর্মীয় পোশাক পরে না? এই আধুনিক স্যুট পরে যাওয়া আমাদের পরিচয়ের সঙ্গে মানায় না। তোমাকে তো সরকারি কর্মচারীর মতো লাগছে।’ আমি কথাটা বলতেই সে আবার চড় মারতে উদ্যত হল, ভাগ্যিস আমি দ্রুত সরে গেলাম।

‘তুমি কিছুই বোঝো না। কাল বদলেছে, আমাদেরও বদলাতে হবে। নইলে যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে আমরা হারিয়ে যাব। এখন এই পোশাক পরে বাইরে বেরোতে সাহস করো দেখি, লোকজন তোমাকে কুসংস্কার ছড়ানোর অপরাধে ধরে নিয়ে যাবে।’ তার যুক্তিতে আসলে কিছু বলার ছিল না। সত্যিই এখনকার দিনে এসব ব্যাপারে বিশ্বাসী লোক কমে গেছে।

এমন সময় নিচতলা থেকে কলিং বেলের শব্দ এল, সঙ্গে খুব বিনীত এক কণ্ঠস্বর, ‘মাফ করবেন, গুডাওজি গুরুজি আছেন?’ এ কণ্ঠটা ছিল কিঞ্চিৎ কর্কশ, শুনতে অনেকটা রাজকীয় যুগের খাসকামরার ইউনিকের মতো। মুটে স্যুট ঠিকঠাক করে হেসে বলল, ‘এসেছি।’ সে আমাকে নিয়ে নিচে নামল। সাধারণত এই পথ এক-দুই মিনিটে শেষ করা যায়, কিন্তু মুটে ইচ্ছাকৃতভাবে তিন-চার মিনিট ধরে হাঁটল। কারণ জানতে চাইলে সে বলল, তার মর্যাদা প্রদর্শন করতে গতি কমাতে হয়।

‘গুরুজি, আপনি অবশেষে এলেন। চলুন, দেরি করলে আবার বিপদ হতে পারে।’ নিচে নেমেই দেখি এক হাড়জিরজিরে মধ্যবয়সী ব্যক্তি লাল চকচকে স্যুট পরে উদ্বিগ্নভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে দুইজন দেহরক্ষী, দারুণ শক্তিশালী, দেখে মনে হয় যেন দুইটি লাল ষাঁড়। তাদের পাশে ওই ব্যক্তি যেন কোনো দুর্বল গৃহবধূ। তিনি তৎক্ষণাৎ দৌড়ে এসে মুটেকে হাত মেলাতে চাইলেন, কিন্তু মুটে তার হাতের দিকে তাকিয়েও দেখল না, এতে তার মুখে অপমানের ছাপ ফুটে উঠল।

মুটে কেবল মাথা নাড়ল, গলা ছিল অবিশ্বাস্য রকমের শীতল, ‘চলো।’ এই মধ্যবয়সী লোকটির গায়ের অলংকার আর পোশাক দেখেই বোঝা যায়, সে অন্তত বড়লোক। সাধারণত এমন লোকেরা কারও তুচ্ছতা মেনে নেয় না, কিন্তু আজ সে মুটের অনুগ্রহ ভিক্ষা করছে বলে বাধ্য। সে যেন ছোটভাইয়ের মতো পেছনে পেছনে ছুটতে লাগল। আমি অবাক হয়ে মুটের দিকে তাকালাম—সাধারণত সে টাকার গন্ধ পেলেই গা গরম করে বড়লোকদের আরও পেছনে ঘুরে বেড়ায়, আজ যেন সে বদলে গেছে।

মধ্যবয়সী লোকটি এবার মুটের জন্য গাড়ির দরজা খুলল, বাইরে ছিল বিলাসবহুল গাড়ি। এই প্রথমবার এত দামি গাড়িতে ওঠার সুযোগ পেয়ে আমি রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলাম। কিন্তু ঠিক তখনই কাছের রাস্তা থেকে একটানা সাইকেলের বেল বাজতে শুরু করল।

আমরা সবার দৃষ্টি সেদিকে গেল। দেখি, এক যুবক সাইকেল নিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে আসছে, সে দেখতে আমার মতোই, কিন্তু দারুণ শক্তিশালী, যেন ছোট ষাঁড়। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল এই সাইকেলটাই তার মোটরসাইকেল, পথচারীরা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।

‘একটু দাঁড়ান, একটু অপেক্ষা করুন।’ সেই যুবক চিৎকার করতে করতে ছুটছিল। আমি কৌতূহলী হয়ে মুটের স্যুট টেনে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ভাই, সে কি তোমার জন্য এসেছে?’ মুটেও বিভ্রান্ত হল, ওঠার গতি কমিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। এতে মধ্যবয়সী লোকটি আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল।

‘গুরুজি, বলুন তো...’ সে কথা শেষ করার আগেই মুটে চোখ রাঙিয়ে বলল, ‘কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে পারছো না? তাহলে তো আমি আর তোমার সময় নষ্ট করব না।’ এতে লোকটি ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল, আর কিছু বলার সাহস পেল না।

এসময় সেই যুবক সাইকেল নিয়ে কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘গুডাওজি গুরুজি আছেন?’ মুটে তার দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে বলল, ‘তোমার গায়ে অশুভ শক্তির ছায়া, সম্প্রতি কি কোনো অশুভ শক্তির ছোঁয়া পেয়েছ?’ মুটের কথা শুনেই যুবক ভয়ে প্রায়跪ে পড়ার উপক্রম করল, একটানা বলতেই লাগল, ‘গুরুজি, আপনি অসাধারণ। আমাদের গ্রামে বিপদ হয়েছে, দয়া করে আমাদের রক্ষা করুন।’

তাঁর কথা শুনে আমার মনে সংশয় জাগল, কারণ দেখে মনে হচ্ছিল মুটে আর এই যুবকের পূর্বপরিচয় নেই। তবু সে কীভাবে জানল মুটে একজন বিশেষজ্ঞ? নাকি শুধু মুটের কথাতেই সে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিল?

‘তুমি জানলে কীভাবে যে সে তোমাকে সাহায্য করতে পারবে?’ আমি জানতে চাইলাম। আমার কথা শুনে যুবক একটু লজ্জা পেল, আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ছোট গুরুজি, আপনি তো মজা করছেন। আমি শুধু গুডাওজি গুরুজিকে চিনি না, আপনাকেও চিনি। আমি ছোট হ্রদপুরের মানুষ। আগেরবার যখন আপনারা আমাদের গ্রামে ভূত ধরতে এসেছিলেন, আমি একপাশে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।’

আমি থমকে গেলাম। বুঝতেই পারিনি, সে সেই দুর্ভাগা গ্রামের লোক। প্রথমবার মুটের সঙ্গে ভূত ধরতে গিয়ে ওখানেই বিপদে পড়েছিলাম। তবে তাদের গ্রামের অশুভ শক্তি তো দূর করা হয়েছিল, তবে আবার কী ঘটল?

‘তোমাদের গ্রামে আবার কী হয়েছে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘আমাদের গ্রামের মোড়ে এক বিশাল শিমুলগাছ আছে না? আগেও গুরুজি বলেছিলেন, ওটা অশুভ, গ্রামের বিপদ ডেকে আনবে। তাই মেম্বাররা মিলে গাছটা কাটতে চেয়েছিল। কে জানত, গাছে কুড়াল বসাতেই গাছের গোঁড়া থেকে রক্ত বেরিয়ে এল। তখন সবাই বুঝল, গাছটা অপয়া। তাই চারপাশে পীচ কাঠের ডাল রেখে আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দিলাম।’

পীচ কাঠে অশুভ শক্তি দুর্বল হয়, তাই এই পদ্ধতিটা খারাপ হয়নি।

‘তারপর কী হল?’ আমি জানতে চাইলাম।

‘গাছটা পুড়ে শেষ হলে ওর নিচে দেখা গেল এক বিশাল গর্ত। সেখানে আমরা একটা প্রাচীন সমাধি পেলাম। ভেতরে কিছুই ছিল না, শুধু একটা রক্তাক্ত কফিন। মেম্বাররা ভেবেছিল, এটা অশুভ সংকেত। তাই কফিনটা বের করে পীচ কাঠের পাশে রেখে আগুন দিতে চেয়েছিলাম।’

‘কিন্তু তখন থেকেই যেন বিধাতা আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা করতে লাগল। কফিনটা উঠানো মাত্র বৃষ্টি শুরু হল, টানা ছয় দিন ধরে বৃষ্টি থামল না। আজ সকালে সেই বৃষ্টি ফুরিয়েছে। আর এই সময়ের মধ্যে আমাদের গ্রাম থেকে একের পর এক মানুষ নিখোঁজ হতে লাগল। মেম্বাররা অনেক খুঁজেও কাউকে খুঁজে পায়নি।’

যুবক হাপাতে হাপাতে বলছিল, আমি মুটের দিকে তাকিয়ে দেখি তার মুখও গম্ভীর হয়ে গেছে।

এবার যুবক আবার বলল, ‘মেম্বাররা ভাবল, আমরা এটা সামলাতে পারব না, তাই আমাকে গুরুজিকে আনতে পাঠাল। গুরুজি, দয়া করে আরেকবার আমাদের গ্রামে চলুন।’ তার মুখে এমন কাতর অনুরোধ ছিল, মনে হচ্ছিল মুটে রাজি না হলে সে跪ে পড়বে।

কিন্তু মুটে কিছু বলার আগেই মধ্যবয়সী লোকটি চেঁচিয়ে উঠল, ‘আগে কে এসেছে জানো তো? আমি তো দশ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়েছি, তোমরা পারলে এত টাকা দাও, নইলে সরে যাও।’