দ্বিতীয় অধ্যায়: ভূতের বউ

ছায়া-দূত পরিবর্তন করো সংজ্ঞা 3306শব্দ 2026-03-19 08:31:41

গ্রামের বয়স্করা সবাই জানেন ‘ছায়া-বিবাহ’ নামে একটি প্রথার কথা। এ হলো জীবিত মানুষের সঙ্গে মৃত ব্যক্তির বিবাহ, যেন এক ধরনের সমমূল্য বিনিময়, নিজের সারাজীবনের সুখ দিয়ে পরিবার-পরিজনের প্রজন্মের শান্তি কেনা। ছায়া-বিবাহের কিছু কঠিন নিয়ম রয়েছে—যদি না আত্মা নিজে থেকে মুক্তি দেয়, সেই সময়ের মধ্যে জীবিত ব্যক্তির কারও সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক চলবে না, নইলে বড় বিপর্যয় আসবে।

অন্তিম পরিস্থিতি ছাড়া কেউই এমন সিদ্ধান্ত নেয় না। কখনো সহজ স্বভাবের আত্মার সঙ্গে দেখা হলে, সর্বোচ্চ দশ-পনেরো বছর ঝামেলা হয়, তারপর আবার নতুন করে বিয়ে করা যায়। কিন্তু যদি দুর্বিনীত আত্মা হয়, তবে আজীবন পিছু ছাড়ে না।

তাই দাদুর কথা শুনে ঠাকুমার ভুরু কুঁচকে যায়। দাদু তার দুশ্চিন্তা বুঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, পাশ থেকে এক টুকরো হুঁকা নিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলেন, ‘‘অন্যথায়, আমাদের পুরো পরিবারই ধ্বংস হবে।’’

ঠাকুমা অনেক ভেবেচিন্তে মাথা নাড়েন, শেষমেশ দাদুর প্রস্তাবে রাজি হতে বাধ্য হন। আমি তখন ছোট হলেও দাদু-ঠাকুমার কথার অর্থ বুঝতে পেরেছিলাম।

‘‘দাদু, আমি ভয় পাই না, আমি ছায়া-বিবাহে রাজি।’’

আমি চাইনি আমার কারণে দাদু-ঠাকুমা বিপদে পড়ুন। আমি জানতাম ওনারা আমাকে খুব ভালোবাসেন, কখনোই আমার অমঙ্গল চাইবেন না।

তবে আমি ছিলাম নীতিবান এক ছোট ছেলে—আমার জন্য ছায়া-বিবাহ চাইলে হবে, তবে সুন্দরী কোনো আত্মা-বউ চাই, নইলে রাতে ঘুম ভেঙে ভয়ংকর মুখ দেখলে, আমি তো জল-আত্মার হাতে মরার আগেই নিজের বউয়ের ভয়ে মরে যাব!

দাদু আমার কথা শুনে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘‘তুই তো বোঝদার ছেলে।’’

এই সময় ঠাকুমা হঠাৎ দাদুর জামা টেনে ধরলেন, পাশের ঘরের কফিনটার দিকে ইঙ্গিত করলেন। ‘‘ওটা কি...?’’ ঠাকুমার মুখে কিছু বলার মতো অবস্থা ছিল না, কেবল ইঙ্গিত করলেন। দাদু সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘চরম প্রয়োজন না হলে ও কফিনে হাত দেওয়া যাবে না, নইলে পুরো গ্রামই কবরে যাবে।’’

এই কথা বলেই দাদু আমাকে নিয়ে পাহাড়ি পুরোনো কবরস্থানে গেলেন। ওটা আগে ছিল এক অজানা কবরস্থান, দশ-বিশ গ্রামের মানুষ ওখানেই কবর হয়, দিনের আলোতেও জায়গাটা অশরীরী জগতের মতো, অকারণে যেন চারপাশে ঠান্ডা হাওয়া বইছে।

দাদু হাত ধরে এক এক করে কবরের ছবি দেখতে লাগলেন। পুরোনো কবর ছেড়ে নতুন কবরের দিকে মন দিলেন, যেখানে সদ্যপ্রয়াতা যুবতীদের কবর, ছবি সেঁটে দেওয়া। দাদু আমার জন্য এমন কোনো কবর খুঁজছিলেন, যাদের বিয়ে হয়নি।

কবর পেলে, পূর্ব-দক্ষিণ কোনে সাদা মোমবাতি জ্বালাতেন, তিনটি ধূপ জ্বালিয়ে কবরের সামনে মাথা ঠুকতেন।

‘‘তার নাম তিয়েনইয়ো, জন্ম সাল এই, মাস এই, দিন এই, ছায়া মাসে জন্ম, ভাগ্যের ফেরে অশুভ আত্মা লেগেছে, তাই কন্যার সাহায্য চাইছি ছায়া-বিবাহে, আমাদের লি পরিবারের জন্য বিপদ মুক্তি ও কল্যাণ কামনা করছি, চিরকাল পূজা করব।’’

দাদু হাঁটু গেড়ে ভদ্র ভাষায় বলতেন, তারপর সোজা কথায় বলতেন, ‘‘মেয়ে, এ আমার নাতি লি তিয়েনইয়ো, তার জন্ম-তারিখও দিলাম, ছেলেটার ভাগ্য খারাপ, জন্ম থেকেই দুই চোখে অদ্ভুত ক্ষমতা, কিছুদিন আগে এক জল-আত্মা ওকে পছন্দ করেছে, বলি খুঁজছে, উপায়ান্তর না দেখে ছায়া-বিবাহ চাইছি। তুমি যদি রাজি হও, চিরকাল তোমার পূজা করা হবে, এ উপহার, তুমি চাইলে নিয়ে নাও।’’

বলতে বলতে দাদু কোঁচড় থেকে এক টুকরো হলুদ কাগজ বের করলেন। তখন ভেবেছিলাম দাদু বড় কৃপণ, কারও কাছে বর দেখতে গিয়ে শুধু এক টুকরো কাগজ দেয় নাকি! পরে বুঝেছিলাম, ওই কাগজের বিশেষ অর্থ রয়েছে।

সব বলা হলে, দাদু ধূপ কবরের সামনে গেঁথে দিতেন—যদি ধূপ তাড়াতাড়ি পুড়ে যেত, তবে মেয়ে রাজি হয়েছেন। কিন্তু ধূপ মাটিতে গেঁথে দেওয়া মাত্র শক্তিশালী ধোঁয়া হঠাৎ নিভে গেল।

মানে, মেয়ে আত্মা রাজি নন। দাদু মাথা নেড়ে হলুদ তাবিজ তুলে নিলেন, আমাকে নিয়ে অন্য কবর খুঁজতে চললেন।

আমি দাদুর পেছনে ছোটাছুটি করতে করতে বুঝে গেলাম, ছায়া-বিবাহ মানে আমি যেন হাটের সবজির মতো, সবাই যাচাই করছে। কিন্তু আমার কপাল বোধহয় খুব খারাপ, সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলেও কেউ বিয়ে করতে চায় না।

‘‘উফ, ওই জল-আত্মা ভীষণ শক্তিশালী।’’

শেষে দাদু আমাকে নিয়ে ঘরে ফিরে দুঃখ করে বললেন। ঠাকুমা আমাকে কোলে নিয়ে বললেন, ‘‘এই পুরো দিনেও কাজ হলো না কেন? আমাদের তিয়েনইয়ো দেখতে তো বেশ মিষ্টি, ওকে কেউ পছন্দ করছে না কেন!’’

ছোটবেলায় আমি ফর্সা, টুকটুকে ছিলাম, সবাই ভালোবাসত। দাদু বললেন, ‘‘অনেক অকালে মৃত বা পুনর্জন্ম নিতে না পারা আত্মা তো ছায়া-বিবাহ চায়, এতে ছায়া-বিবাহ শেষ হলে আবার জন্ম নিতে পারে। কিন্তু এই জল-আত্মা এত ভয়ংকর যে, যাদের পেয়েছিলাম সবাই ভয় পেয়ে রাজি হয়নি।’’

রাত হয়ে এলো, একটু পরেই জল-আত্মা আবার আসবে, দাদুর মনে তখন অস্থিরতা। তিনি রাগে হলুদ তাবিজটা টেবিলে ছুঁড়ে ফেলে দেন। তখনই বাইরে হঠাৎ এক অশরীরী বাতাস বইতে থাকে, বাতাস এসে হলুদ তাবিজটা উড়িয়ে পাশের ঘরে নিয়ে যায়।

‘‘ওহো, মুশকিল।’’

দাদু হতভম্ব হয়ে ছুটে গেলেন, তাবিজ নিতে চাইলেন, কিন্তু ঘরে গিয়ে দেখলেন, তাবিজটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

দাদুর মুখে মিশ্র অনুভূতি—ভয়, আবার যেন আনন্দও, তিনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন, কী করবেন বুঝে উঠতে পারলেন না।

ঠাকুমা কাছে এসে আস্তে দাদুর জামা টেনে বললেন, ‘‘তোমার তাবিজটা কি ওনি নিয়ে গেলেন?’’

দাদু চুপচাপ মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘ভাগ্য মন্দ হলে কেউ আটকাতে পারে না।’’

আমি বুঝতে পারছিলাম না দাদু এত দুশ্চিন্তা করছেন কেন। তাবিজ হারিয়ে যাওয়ার মানে তো ছায়া-বিবাহ সফল, এটাই তো দাদুর চাওয়া ছিল! তাহলে এখন দাদু এত দ্বিধায় কেন?

এই কফিনটা আমি হুঁশ হওয়ার পর থেকেই পাশের ঘরে রয়েছে। দাদু প্রতিদিন সেখানে গিয়ে পরিষ্কার করেন। একবার কৌতূহলবশত ঢুকতে গিয়ে ধরা পড়েছিলাম, খুব ভালোবাসলেও সে দিন দাদু বাঁশের ঝাড় দিয়ে আমাকে বেদম পেটান, কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, ‘‘তুই লি পরিবার শেষ করে দিবি।’’

তখন থেকে ওই ঘর আমার কাছে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এখনও দাদু আমাকে নিয়ে গেলে ভয় লাগে।

এবার দাদু তিনটি ধূপ নিয়ে কফিনের সামনে মাথা ঠুকতে লাগলেন। তিনি ধূপ কফিনের সামনে স্থাপন করলেন, ধীরে পুড়তে থাকা ধূপ হঠাৎ কেঁপে উঠল, তারপর যেন বেগে ত্রিশগুণ বেড়ে গেল, ধোঁয়া ঝড়ের মতো উঠল, দুই-তিন মিনিটেই সব ধূপ পুড়ে ছাই।

দাদুর মুখে তখন আনন্দের ছাপ। ‘‘আপনি তাবিজটি, ধূপ গ্রহণ করেছেন, তাহলে কি সত্যিই আমার নাতির সঙ্গে ছায়া-বিবাহে রাজি হলেন? জানেনই তো, আমরা গরিব, আপনাদের যোগ্য নই।’’

আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলাম। কফিনে তো কখনো কিছু দেখিনি, দাদু কাদের সঙ্গে কথা বলছেন? এই কফিনের সত্যিই কী রহস্য?

আরও অবাক বিষয়, এখানে সত্যিই কোনো নারী আত্মা আছে কি? আমার তো অদ্ভুত চোখ আছে, কোথাও আত্মা থাকলে দেখতে পাই, কিন্তু এখানে তো কেবল দাদু, ঠাকুমা আর কফিন ছাড়া কেউ নেই।

কেউ দাদুর প্রশ্নের জবাব দিলো না, কিন্তু তখনই বাইরে আবার এক ঝটকা হাওয়া বইল। গরম গ্রীষ্মের রাতেও সে হাওয়ায় কাঁপুনি ধরাল। শীতের রাতের মতো ঠান্ডা।

বাতাস আমার গা ছুঁয়ে যায়, মনে হলো বরফের মতো ঠান্ডা হাত আমার শরীর ছুঁয়ে গেল। আমি কেঁপে উঠলাম, গা-হাত কাঁটা দিলো।

দাদু খুশিতে আমাকে টেনে কফিনের সামনে এনে বললেন, ‘‘তিয়েনইয়ো, তাড়াতাড়ি তোমার ভবিষ্যৎ বউকে তিনবার প্রণাম করো, ও তোমার প্রাণ বাঁচিয়েছে।’’

আমি রক্তলাল কফিনের দিকে তাকিয়ে থাকলাম, হাঁটু গেড়ে বসতে চাইলে, শরীর যেন কারও বাঁধা পড়ল, নাড়াতে পারলাম না।

ঠিক তখনই এক মিষ্টি, সুরেলা কণ্ঠ ভেসে এলো, যেন গানের পাখি গাইছে।

‘‘লি পরিবার আমার সঙ্গে ভাগ্যবশত যুক্ত, আমি ছায়া-বিবাহে সম্মত, তাই লি পরিবারকে রক্ষা করব, আমার স্বামীকেও, কৃতজ্ঞতার কথা ভুলে যাও, স্বামী কখনো স্ত্রীর সামনে নত হয় না, এটা নিয়মবিরুদ্ধ।’’

আমার মনে হলো, এ নারী আত্মা আধুনিককালের নয়, সুযোগ থাকলে জানতে চাইতাম, কোন যুগের মানুষ তিনি।

বিষয় শেষ হতে না হতেই বাইরে হঠাৎ গর্জন উঠল। আমরা তিনজন ছুটে বাইরে গেলাম। দেখতে পেলাম, ঘন কালো মেঘ আকাশ ঢেকে আছে, তারার আলো হারিয়ে গেছে, চারপাশে ঝড়ো বাতাসে গাছগুলো অশুভ ছায়ার মতো ডানা ঝাপটাতে লাগল।