৪৮. আমরা দেরিতে এসেছি।
একজন অভিজ্ঞ বার্তাবাহক হিসেবে, ত্রিশের কোঠায় পা দেওয়া মিয়ুরা তাইচি তার অধিনায়ক সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত ছিলেন।
এ ব্যক্তি নিজের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যে কোনো পন্থা অবলম্বনে কুণ্ঠাবোধ করেন না, এমনই এক নির্মম মানুষ।
একসময় তাঁর মধ্যেও দেশপ্রেম ও ন্যায়বোধ ছিল, কিন্তু অধিনায়কের নিষ্ঠুরতা দীর্ঘদিন দেখে দেখে তাঁর মনে “ন্যায়বোধ” শব্দটির অর্থ ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে আসে এবং শেষমেশ তিনিও অধিনায়কের মতো একজন হয়ে ওঠেন।
ঠিক এই কারণেই, তিনি টিকে থাকতে পেরেছেন এবং অধিনায়কের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সঙ্গীতে পরিণত হয়েছেন।
যখন প্রথমবার নিজের মিত্র জাহাজে গোলাবর্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তখন মিয়ুরা তাইচিই ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি নির্দ্বিধায় আদেশটি পৌঁছে দেন।
তিনি ভেবেছিলেন, এমন বিশ্বস্ত আনুগত্যের ফলস্বরূপ পুরস্কার পাবেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেয়েছিলেন নির্মম পরিত্যাগ।
কারণ, যে যুদ্ধজাহাজে তিনি ছিলেন, সেটিই ছিল ব্লু নাইটের বেছে নেওয়া আড়াল!
তাই, অধিনায়ক যখন গোলাবর্ষণের নির্দেশ দেন, মিয়ুরা তাইচির প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল হতবাক হয়ে যাওয়া; পরক্ষণেই তিনি একটুও শব্দ না করে বার্তাকক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন, দৌড়ে গুদামে গিয়ে একটি লাইফ বয়া নিয়ে নেন এবং নিজের যুদ্ধজাহাজের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে সাগরে ঝাঁপিয়ে পালিয়ে যান।
তিনি যে জায়গা থেকে ঝাঁপিয়েছিলেন, তা ছিল ব্লু নাইটের ডান পাশে ত্রিশ মিটারেরও কম দূরত্বে। খুব কাছেই, কিন্তু আশেপাশের যুদ্ধজাহাজের গোলার আওতায় নয়।
ঝাঁপ দেওয়ার সময়টাও ছিল নিখুঁত—যখন অধিনায়ক খালি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিলেন। ব্লু নাইট তখন প্রতিরক্ষা পুনর্গঠনে ব্যস্ত, একজন সাধারণ নৌসেনার দিকে নজর দেওয়ার সময় কারও ছিল না।
ঝাঁপ দেওয়ার ভঙ্গিটাও ছিল চমৎকার—শরীরে ছিল কেবল এক জোড়া পাতলা হাফপ্যান্ট, কোনো অস্ত্র লুকানোর সুযোগ নেই, যাতে ব্লু নাইটের মাথায় তাকে হঠাৎ মেরে ফেলার চিন্তা না আসে।
খুবই ছলনাময়ী একজন মানুষ।
ব্লু নাইট প্রথম দফার গোলাবর্ষণ প্রতিহত করে এবং বায়ুবিস্ফোরক দিয়ে পাশের যুদ্ধজাহাজের কামান ধ্বংস করবার পর, মিয়ুরা তাইচি পালিয়ে যায়নি, বরং সাঁতরে ব্লু নাইটের ভেলায় আসার চেষ্টা করল।
তাঁর সিদ্ধান্তটি ছিল নিখুঁত।
আগের জাহাজ ডুবে যাওয়ার দৃশ্য এখনও স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে, সেই ভয়ানক ঘূর্ণাবর্ত থেকে তাঁর পক্ষে বাঁচা অসম্ভব।
একটিমাত্র আশ্রয়—ব্লু নাইটের ভেলা।
ব্লু নাইট যখন বুঝতে পারল, এই নৌসেনা তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে, তখন সে দ্বিধায় পড়ে গেল। সত্যিই কি তাকে ভেলায় উঠতে দেওয়া উচিত?
হয়তো একটু আগেই সে নিজেই কামান চালিয়ে ব্লু নাইটকে আঘাত করেছে।
মিয়ুরা তাইচি বুঝতে পারল ব্লু নাইটের দ্বিধার কারণ, ভেলার দশ-পনের মিটার দূরে থেমে চিৎকার করে বলল, ‘‘আমি সরবরাহ শাখার নৌসেনা, একজন রাঁধুনি, আগে কোনো আক্রমণের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই। দয়া করে আমাকে বাঁচান, আমি চুপচাপ ভেলায় থাকব, শুধু বেঁচে থাকতে চাই!’’
মিয়ুরা তাইচির করুণ আকুতি শুনে ব্লু নাইটের কপাল আরও কুঁচকে গেল, সে যেন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। মিয়ুরা তাইচি পরীক্ষা করতে করতে ধীরে ধীরে ভেলার দিকে এগোতে থাকল, কিছুক্ষণ দোদুল্যমান থেকে ব্লু নাইট ডান হাত উঁচিয়ে তালু মিয়ুরা তাইচির দিকে তাক করল।
‘‘না, দয়া করে আমাকে মারবেন না...’’
বুম!
মিয়ুরা তাইচি সাহায্যের কথা শেষ করার আগেই ব্লু নাইট নিজের বিকর্ষণশক্তি ব্যবহার করে উড়ে গিয়ে মিয়ুরা তাইচির দিকে আসা একটি গোলা ফিরিয়ে দেয়, যা তাঁর ঠিক পেছনের সমুদ্রে ফেটে যায়। সেই বিস্ফোরণের ঢেউ সরাসরি মিয়ুরা তাইচিকে ভেলার কাছে ঠেলে দেয়। যখন তাঁর মাথা ভেলায় আঘাত করতে যাচ্ছিল, তখনই ব্লু নাইট ভ্রু কুঁচকে আকর্ষণশক্তি বাড়িয়ে তাঁকে পানির উপর থেকে ভেলায় তুলে এনে এক কোণে ফেলে দিল।
‘‘চুপচাপ শুয়ে থাকো, নড়াচড়া কোরো না। আমি যদি তোমায় বাঁচাতে পারি, তাহলে মারতেও পারি।’’
শান্ত ভঙ্গিতে এ কথা বলে ব্লু নাইট মিয়ুরা তাইচির ছোট গোঁফের দিকে একপলক তাকাল, তারপর আর কোনো খেয়াল না করে চারপাশের উড়ে আসা গোলা ও গুলি প্রতিহত করতে মনোযোগ দিল। মাঝে মাঝে তাঁর হাতে থাকা জাদুকরী কার্ড ছুড়ে দিয়ে কিছু গোলা দূরে থেকেই ফাটিয়ে দিচ্ছিল।
বিকর্ষণশক্তি ব্যবহার করে গোলা ফেরানোর শক্তি খরচ, জাদুকরী কার্ড ব্যবহারের চেয়ে তিনগুণ বেশি।
এখন তাঁর জীবনশক্তি খুব বেশি নেই, যতটা সম্ভব সাশ্রয় করতে হবে।
এটা তিনি দ্বন্দ্বের আসরে শিখতে পারেননি—ওখানে শত্রু সর্বদা একজন, কখনোই ঘেরাও হয়ে যুদ্ধের স্বাদ পাওয়া যায় না।
হুম, ভবিষ্যতে যদি কখনো ‘‘বহুরূপী ফল’’ জাতীয় কিছু থাকে, তবেই সম্ভব হতে পারে।
দ্বন্দ্বের আসরে দিনের পর দিন ‘‘মরে’’ যাবার মজবুত অভিজ্ঞতা নিয়ে ব্লু নাইট দ্রুতই ঘেরাওয়ের ছন্দে অভ্যস্ত হয়ে উঠল এবং বিকর্ষণশক্তির প্রতিরক্ষা বলয় তিন মিটারে সংকুচিত করল, যাতে গোলা সেখানেই ফেটে যায় এবং তার সৃষ্ট প্রতিঘাত তরঙ্গে ভেলা সাগরে ভেসে অন্য গোলা এড়াতে পারে।
এভাবে ভেলা হয়ে উঠল অধরা; যাঁরা নিশানা ধরেছিলেন, তাঁরা ব্লু নাইটের গতিপথ ধরতে পুরোপুরি হিমশিম খেয়ে গেলেন। শেষে আন্দাজে একটি বড় পরিসরে গোলা ছুড়তে লাগলেন, দেখার জন্য সৌভাগ্যের দেবী কার পক্ষে থাকেন।
অবশ্যই, সৌভাগ্যের দেবী ব্লু নাইটের পক্ষেই ছিলেন।
ঠিক সেই সময়, যখন ব্লু নাইট ক্রমে ঘেরাওয়ের ছন্দে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিল, তখনই যুদ্ধজাহাজ দ্বীপ থেকে হাওয়ায় ভেসে এল তিনটি মানবাকৃতি। তারা নেমে পড়ল ঠিক ব্লু নাইটের ভেলার উপরেই।
ব্লু নাইট: ‘‘...’’
জিজ্ঞাসা করার দরকার নেই, ছুটে আসা তিনজন নিঃসন্দেহে লুফি আর তার সঙ্গে টানতে বাধ্য হওয়া সাঞ্জি ও জোরো।
‘‘এই ব্লু নাইট! আমরা তোমাকে সাহায্য করতে এসেছি!’’ লুফি খুশি হয়ে হাত নেড়ে ডাকল।
‘‘হ্ম্, এবার ঠিক নিশানায় নামলাম।’’—জোরোর অবজ্ঞা।
‘‘হ্যাঁ, ব্লু নাইট, আমাদের সরাসরি ওইখানে পাঠিয়ে দাও।’’—সাঞ্জি অধিনায়কের বিশাল যুদ্ধজাহাজের দিকে ইশারা করল।
আকাশে এমন হঠাৎ সাক্ষাতে, লুফি-জোরো-সাঞ্জির মনে হয়েছিল ব্লু নাইট নিশ্চয়ই তাদের ধরে নেবে এবং বিকর্ষণশক্তি দিয়ে সরাসরি গন্তব্যে পৌঁছে দেবে, অর্থাৎ অধিনায়কের জাহাজে।
কিন্তু, ব্লু নাইট একবার নিজের অবশিষ্ট ১৪০০-এর কিছু বেশি জীবনশক্তির দিকে তাকাল, লুফি-জোরোর সংঘাতের গতি হিসেব করল, আর তিনজনকে এক কিলোমিটার দূরের প্রাণভয়ে পালানো অধিনায়কের জাহাজে পাঠাতে গেলে কমপক্ষে ৫০০ পয়েন্ট জীবনশক্তি খরচ হবে।
যদি জীবনশক্তি পূর্ণ থাকত, তাহলে ব্যাপারটা সহজ ছিল, কিন্তু এখন...
হুম, ব্লু নাইট মুখ ঘুরিয়ে শিস দিতে লাগল, ৫ পয়েন্ট জীবনশক্তি খরচ করে পাশ দিয়ে সরে গিয়ে নিখুঁতভাবে লুফি-জোরো-সাঞ্জির পাশে দিয়ে চলে গেল!
লুফি: ‘‘হ্যাঁ?’’
জোরো: ‘‘...’’
সাঞ্জি: ‘‘!!!’’
প্লাস! প্লাস! প্লাস!
ঝপঝপ শব্দে তিনজনই হতবুদ্ধি হয়ে সাগরে পড়ে গেল, দুর্ভাগা লুফি হাঁ করে বেশ কিছু ঢেউ পান করল, শরীর ঝিমঝিম করে এল এবং সাঞ্জি-জোরো মিলে তাকে ভেলায় তুলে দিল।
‘‘এই ব্লু নাইট, তুমি আমাদের ধরলে না কেন!’’ জোরো চটে গেল, ‘‘আমার সিগারেটও নিভে গেল, তুমি আসলে কী... এই! তুমি কী করছো! অপেক্ষা করো, একদিন ঠিকই দেখিয়ে দেবো!!!’’
জোরোর অভিযোগ শেষ হওয়ার আগেই ব্লু নাইট তাঁকে নিজের হাতে টেনে নিয়ে শত মিটার দূরের এক যুদ্ধজাহাজে ছুড়ে দিল।
আকাশে ভর করার কোনো উপায় না পেয়ে জোরো মনে মনে শপথ করল, একদিন সে তার অধিনায়ক আর ‘‘সহকারী অধিনায়ক’’ দুজনকেই কেটে ফেলবে।
সাঞ্জি চারপাশে তাকাল, কিছু বলতে গিয়েও গিলে ফেলল; জোরোকে যুদ্ধজাহাজে ছুড়ে দেওয়া দেখে সে লুফির পেটে এক লাথি দিল, লুফি মুখ দিয়ে এক ফোয়ারা পানি উগরে দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল।
সমুদ্রের জল, শয়তান ফলের ক্ষমতাধারীদের জন্য সত্যিই ভয়াবহ।
কিছুটা সুস্থ হয়ে লুফিও চিৎকার দিল, ‘‘ব্লু নাইট, তুমি আমাদের ধরলে না কেন...’’
‘‘থামো লুফি!’’—সাঞ্জি-ই এবার তাকে থামাল, ‘‘ভালো করে চারপাশ দেখো, দেরি করে এসেছি আমরাই!’’
------
ধন্যবাদ:
‘অ্যাং স্টার’—পাঁচশো পয়েন্ট কয়েন উপহার।