একাত্তরতম অধ্যায় — ভ্রাতৃত্বের তারা
হু ইহু যোদ্ধাদের সংগে নিয়ে নভোচারীদের সহায়তায় ক্লোন মানুষদের দ্বারা উন্নত নতুন প্রজন্মের মহাকাশযানে চড়ে সরাসরি ইউরোপা চাঁদে পাঠানো হলো মিশনে। তার দায়িত্ব尖াকৃতির ভবনের অন্তর্নিহিত গোপন তথ্য সংগ্রহ, সঙ্গে ক্লোন মানুষরা চাওয়া কিছু পরীক্ষামূলক প্রকল্পও ছিল। মহাকাশযান দ্রুতগতিতে ইউরোপার দিকে এগিয়ে চলল…
ইউরোপায় অবতরণের পর, নভোচারীরা প্রাপ্ত তথ্য আরও বিশ্লেষণ করল। অনুসন্ধানযন্ত্র ভবনের চারপাশের মাটি ও বরফের ওপরে জমা তরল নমুনা নিয়ে এল। নভোচারী সংগ্ৰহ বাক্স খুলে সেসব নমুনা বার করল, একটি যন্ত্রে রেখে স্মার্ট কম্পিউটার চালু করল। মনিটরে সংখ্যাগুলো দ্রুত ঘুরতে লাগল। দেখা গেল, এই তরল পদার্থে জলীয় হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন ছাড়াও পৃথিবীতে অজানা আরও আটটি মৌল আছে। মৌলগুলো ক্রমাগত একে অপরের সঙ্গে গাঁথা ও বিচ্ছিন্ন হয়ে অদ্ভুত জটিল নকশা তৈরি করছিল, যেন এক অদৃশ্য জাল বুনছে। অনুসন্ধানযন্ত্র নানা ধরনের আলো ওই তরলে ফেলছিল। দুর্বল আলোয় কোনো প্রতিক্রিয়া দিচ্ছিল না, কিন্তু নির্দিষ্ট মাত্রার আলো পড়তেই মৌলগুলোর সংযুক্তি দ্রুতগতিতে চলতে লাগল। তরল পদার্থের আকার সঙ্গে সঙ্গে বিলীন হয়ে অনুসন্ধানযন্ত্রে এক টুকরো পাথরে রূপান্তরিত হলো। সেই পাথর নির্দিষ্ট আলোয় নানা অনিয়মিত নকশায় বদলাচ্ছিল। আলো বন্ধ হলে তরল আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেত। নভোচারী নির্বাক বিস্ময়ে দেখল এই অপূর্ব ঘটনা।
তাক খুব তাড়াতাড়ি ইউরোপা থেকে পাওয়া পরীক্ষার তথ্য হাতে পেল। ওই তরলে থাকা সমস্ত মৌল বিশ্লেষণ করে সুপার কম্পিউটার নতুনভাবে সাজিয়ে দেখাল, গবেষণাগারে কৃত্রিমভাবে উৎপন্ন জ্বালানির কিছু মৌলের সঙ্গে এদের আশ্চর্যজনক মিল আছে। এই তরল মৌলগুলো মানবজাতি বহুদিন ধরে সন্ধান করছে এমন নতুন ধরনের জ্বালানি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। ক্লোন মানুষরাও মৌলগুলোর বিন্যাস দেখে বিস্মিত, কারণ এটি গ্রহীজে ৫৮১ডি-তে কখনও দেখা যায়নি। পান লিয়াং সঙ্গে সঙ্গে আদেশ দিল, ‘দূরবীক্ষণকারী এক নম্বর’ যেন এক টন তরল সংগ্ৰহ করে পৃথিবীতে পাঠায় গবেষণার জন্যে।
সময়-দ্বার পেরিয়ে, চারজন আয়নার মতো সমুদ্রপৃষ্ঠ ধরে হাঁটছিল। পায়ের নিচে জল থাকলেও মাটির মতোই কঠিন, শুধু একটু শীতল অনুভূতি, দেহ ডুবে যাচ্ছিল না। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা হাঁটার পর তারা লক্ষ্য করল সমুদ্রের স্রোত একদিকে ছুটছে, অথচ কোনো ঢেউ উঠছে না, বরং সোজা দাগ এঁকে কেন্দ্রীয় অংশে এগোচ্ছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, দূরে বিশাল এক ঘূর্ণাবর্ত সমুদ্রের কেন্দ্রে অবস্থান করছে…
কেন্দ্রের কাছে আসতেই স্রোত আরও গতি পেল। ক্লোন মানুষ তার ওড়ার ক্ষমতা ব্যবহার করে লিউ ফেই-কে সংগে নিয়ে আকাশে তুলে নিল। সকলে উপরে পাক খেতে খেতে নীচের জলস্রোতের গতিপথ দেখল। ওপরে থেকে দেখা গেল, সমুদ্রের কেন্দ্রে বিশাল গভীর এক খাদ, ক্লোন মানুষ আচমকা মনে করতে পারল গ্রহীজে ৫৮১ডি-র সেই রহস্যময় খাদ, এখানকার দৃশ্যও অবিকল তেমনই। জল প্রবল বেগে খাদে ঢুকছে, তৈরি করছে এক গোলাকার জলপ্রপাত। আলো প্রতিসরণের কারণে জলপ্রপাতের কিনারায় আটটি রঙিন সেতু তৈরি হয়েছে। ক্লোন মানুষ কিছু জল সংগ্রহ করল বোতলে ভরে। মাত্র ঢালা মাত্রই বোতল কাঁপতে লাগল, ভেতরের কাগজ ঘুরতে ঘুরতে বেগ বাড়াল, বোতল উপরে ভেসে উঠল। হঠাৎ তরলটা ফোয়ারা হয়ে বেরিয়ে এসে বাতাসে জমে পাতার আকার নিল, বোতলটা হয়ে উঠল গাছের কাণ্ড এবং তাদের সামনে এক সম্পূর্ণ গাছ দৃশ্যমান হলো।
‘‘এটা তো সেই গাছ, যেটা আমরা সিলভার কোর-এ দেখেছিলাম! এখানে কীভাবে?’’ লিউ ফেই জিজ্ঞেস করল।
‘‘এতেই আমাদের পূর্বাভাস সত্য হলো। স্মৃতি-সমুদ্রের তরল কেবলমাত্র উদ্ধারকারীর উপস্থিতিতেই গাছে রূপ নেয়,’’ বলল ক্লোন মানুষ এ।
‘‘তুমি-ই তো সেই ব্যক্তি, যে এই জগতের উদ্ধারকারী,’’ বলল ক্লোন মানুষ বি।
‘‘এ কী হচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছি না!’’ লিউ ফেই বলল।
‘‘আমরা এখানে আটকে গেছি। এখন উদ্ধারের চেয়ে জরুরি হলো এখান থেকে বের হওয়া। আমি আর এখানে থাকতে পারছি না,’’ সে আবার বলল।
‘‘শুধুমাত্র উদ্ধারকারীর আগমনে পবিত্র বৃক্ষ জন্ম নেয়। এই বৃক্ষ তোমাকে দুটি ইচ্ছা পূরণের সুযোগ দেবে,’’ ক্লোন মানুষ বলল।
‘‘তাহলে বোতল আর গাছের মাঝে গভীর সম্পর্ক আছে, তাই তো? তোমার কাছে তো আরও বোতল আছে, আরও কিছু নিয়ে চেষ্টা করো দেখি!’’ লিউ ফেই বলল।
‘‘পবিত্র বৃক্ষ এমনি এমনি আসে না। যার দেখা পায়, তার হয় সৌভাগ্য, নয়তো দুর্যোগ অপেক্ষা করে।’’
‘‘আমরা সিলভার কোর-এও এই গাছ দেখেছিলাম, সঙ্গে মরে গিয়েছিল অনেক ঈগল। আমি শুধু অমঙ্গলই দেখেছি, সৌভাগ্যের কথা ভাবতেও ভয় পাই।’’
এ সময়, পবিত্র বৃক্ষ নিঃশব্দে সমুদ্রের উপর দাঁড়িয়ে ছিল, পাতারা হালকা বাতাসে দুলছিল। সেই গভীর খাদ থেকে হঠাৎ সব জল গাছের কেন্দ্রে ছুটে এল, চারপাশে বিশাল ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি করল। জল সাপের মতো উঠে এসে বৃক্ষকে ঘিরে আটের মতো স্থিত আকার নিল, স্রোত দ্রুত ঘুরছিল। তরলের ভেতরে ধীরে ধীরে মানুষের মুখ ভেসে উঠল—কখনও বড়, কখনও ছোট, এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছিল।
‘‘এত মুখ কেন? অবিশ্বাস্য!’’ লিউ ফেই বলল।
‘‘তোমাদের স্বাগত, দেখছি বহু সহস্র বছর কেটে গেছে। আমি এখানে বহুদিন ধরে অপেক্ষা করছিলাম, অবশেষে তোমরা আমাকে মুক্ত করলে,’’ পবিত্র বৃক্ষের কণ্ঠ শোনা গেল।
‘‘আমরা জানতে চাই এখানে কী ঘটেছে, কেন সবাইকে পৃথিবীর মানুষের স্মৃতি দরকার? কেন এত বোতল বারবার আসছে, আর আমি কেন এখানে পরিচিত মানুষের মুখ দেখি?’’ লিউ ফেই প্রশ্ন করল।
‘‘এই গ্রহের জন্মের পর থেকেই আমরা এখানে আছি। প্রথমে ছিল শান্তি আর সুখের জীবন। কিন্তু এক মহাজাগতিক সংঘর্ষে গ্রহের আশি শতাংশের বেশি প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যায়। বাকি কুড়ি শতাংশও সীমিত সম্পদে টিকতে পারত না, দ্রুত তারা বিলুপ্তির পথে এগোয়। শেষ পর্যন্ত সর্বাত্মক চেষ্টায় মাত্র ২০৩ জন টিকে ছিল। এখানে গ্রহীজে ৫৮১ডি-র ভাইগ্রহ, তাই সবকিছু সেখানে যেমন, এখানেও তেমন গড়ে তোলা হয়। ফলে আমরাও এটিকে গ্রহীজে ৫৮১ডি বলি।’’
‘‘তাহলে এসব স্মৃতিসংক্রান্ত তরলের সংকেত পৃথিবীতে কোথা থেকে পাঠানো হয়?’’
‘‘গভীর খাদ।’’
‘‘এটাই সিলভার কোরে যাওয়ার সবচেয়ে কাছের পথ এবং সংকেতের উৎস। খাদের জল সরাসরি সিলভার কোরের কারখানার জলাধারে যায়, সংকেতও এখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে সিলভার কোরে একত্রিত হয়।’’
‘‘বোঝা গেল। আমরা চাই না আমাদের মানুষ বা এখানকার কেউ বিপদে পড়ুক। কোনো উপায় আছে? সংকেত বন্ধ করা ছাড়া?’’ লিউ ফেই জিজ্ঞেস করল।
‘‘এ বার্তা এখান থেকে নিরন্তর পৃথিবীতে ছড়িয়ে যায়, গ্রহীজে ৫৮১ডি-র ভাষায়, তার উদ্দেশ্য সাহায্য চাওয়া। এখানকার মানুষের বিপদের একমাত্র উপায় তাদেরকে সরিয়ে নেওয়া।’’
‘‘স্মৃতিসংক্রান্ত তরল ছাড়া তারা কতদিন টিকতে পারবে?’’
‘‘এখানে বেশিদিন নয়, কিন্তু সেখানে গেলে তারা পরিবেশের সীমা ছাড়িয়ে বাঁচতে পারবে।’’
‘‘সেখানে মানে?’’
‘‘ওই গ্রহ Y৩-এর পাশের এক ছোট উপগ্রহ, ওখানেই এই গ্রহের সব মানুষ টিকে থাকতে পারবে।’’